টিম বারনার্স লি

ওয়েবের উদ্ভাবক টিম বারনার্স লি

ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ

জাহাঙ্গীর আলম | তারিখ: ০৯-০৬-২০১০

ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ—ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www)। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এটা ব্যবহার করছে। কিন্তু কে আবিষ্কার করেছেন এই ওয়েব? আমাদের ক্ষুদ্র একটা অংশ তাঁর নাম শুনেছে। বিশ্বের অনেক মানুষের কাছে অপরিচিত একটা মুখ। যদিও তাঁর উদ্ভাবন আজ সারা বিশ্বের সব মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। তিনি হলেন টিম বারনার্স লি। তাঁকে বলা হয় ওয়েবের প্রতিষ্ঠাতা। ৮ জুন ছিল তাঁর ৫৫তম জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে এই রচনা।

ফেলে আসা কৌতূহলী শৈশব তাঁর

যদি সত্যিই আমাদের ‘টাইম মেশিন’ থাকত তাহলে ইচ্ছে হলেই চলে যেতে পারতাম ১৯৬০-এর দশকের লন্ডনের একটি বাড়িতে। আর সেখানে দেখতে পেতাম এক যুবককে। মা মেরি উডস লি যে ঘরে রান্না করেন, সে ঘরে যুবকটি বাবা কনওয়ে বারনার্স লির পাশে বসে খেলার সামগ্রী দিয়ে বানানোর চেষ্টা করছে তার নিজের কম্পিউটার। ওই যুবকটিই টিম বারনার্স লি। লি তাঁর চারপাশের জগৎ নিয়ে শৈশব থেকেই খুবই কৌতূহলী। তো একদিন ঘরের কোণে তিনি দেখতে পেলেন নোংরা পুরোনা ও ভিক্টোরিয়ান যুগের এনসাইক্লোপিডিয়া নামের এক গ্রন্থ। গ্রন্থটি সম্পর্কে লি বলেন, ‘ওই বইয়ের রহস্যময় এক শিরোনাম “সবকিছুর ভিতরে ও বাহিরে অনুসন্ধান” আমার কৌতূহল আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলে।’

টিম লির ফেলে আসা সেই সব শৈশবে ঘুরতে গেলে আপনি দেখতে পাবেন, টিম মূলত দুটি বিষয়ের প্রতি খুবই আগ্রহী এবং অনুসন্ধানপ্রিয় বালক এক। এক. কম্পিউটার। দুই. একটি ভাবনা: ‘কী করে মন বা মস্তিষ্ক অনেক ঘটনার মধ্য থেকে কিছু ঘটনাকে সময়ের প্রয়োজনে খুব দ্রুত পাশাপাশি আনে? কী করে গান কিংবা গন্ধ মানুষের মনে জড়িয়ে যায়? এসব নিয়ে ভাবতে ভালোবাসতাম।’ বলেন অনুসন্ধানী টিম লি।

মানুষে মানুষে বিশ্ববন্ধন গড়ার স্বপ্ন যখন

পড়াশোনায় লি অসাধারণ মেধাবী ছিলেন। ১৯৭৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণীতে ডিগ্রি পান। এর চার বছর পর উদীয়মান তরুণটির বয়স তখন ছুঁই ছুঁই পঁচিশ। তিনি পাড়ি জমালেন সুইজারল্যান্ডে। উদ্দেশ্য জেনেভায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান। সেখানে প্রয়োজন পড়লেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা কর্মী তাঁকে প্রশ্ন করত। অনেক সময় প্রশ্নগুলো ছিল একই। ফলে বারবার একই ধরনের উত্তর দিতে হতো। লি তখন চিন্তায় পড়ে গেলেন, ‘কী করে আমার ক্ষুদ্র মাথা সব প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত-প্রতিবেদন ইত্যাদি সর্বদা স্মরণে রাখবে?’ তিনি ভাবলেন, আচ্ছা যদি এমন কোনো পথ থাকত যে কম্পিউটারের মাধ্যমে কর্মীরা তাঁর কাছ থেকে খুব সহজেই সব প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে, যাতে কর্মীরা কে কোথায় কত দূরে আছে সেটা কোনো বাধা হবে না? মানুষে মানুষে বিশ্ববন্ধন গড়ার এক মহাজাগতিক স্বপ্নের শুরু এখানেই, টিম বারনার্স লির হাতে।

ইনকুয়ার: একটি স্বপ্নের সত্যায়ন

এরপর টিম এমন একটা সফটওয়ার প্রোগ্রাম তৈরি করলেন, যেটা গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্যকে সামলাবে। এর জন্য তিনি অনেকগুলো লিংক ব্যবহার করলেন। এবং তিনি এগুলোকে একটা বইয়ে থাকা সূচিপত্রের মতো করে সাজালেন। প্রোগ্রামটির নাম রাখলেন ইনকুয়ার বা অনুসন্ধান। টিম লি এটিকে স্মৃতিশক্তির প্রতিনিধি বলে অ্যাখ্যা দেন। ইনকুয়ার নামটি সেই এনসাইক্লোপিডিয়া বই থেকে নেওয়া, যে বইটি তিনি শৈশবে পেয়েছিলেন তাঁর ঘরের কোণে। এরপর উত্তরোত্তর উন্নতিসাধনের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে যাত্রা শুরু হলো ওয়েবের। বিশ্বের প্রথম ওয়েবসাইটটির নাম ছিল ইনফো.সার্ন.সিএইচ (info.cern.ch)। এবং প্রথম ওয়েবপেজের ঠিকানা ছিল: http://info.cern.ch/hypertext/WWW/TheProject.html।

হতাশা যাঁকে ছুঁতে পারেনি

আপনার কি স্মরণে আছে, বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের পর টমাস আলভা এডিসন হতাশা ও ব্যর্থতা সম্পর্কে কী বলেছিলেন? ‘আপনি নাকি ১০ হাজার বার ব্যর্থ হয়েছেন বাতি জ্বালানোর আগে?’ এর জবাবে এডিসন বলেছিলেন, ‘ব্যর্থতা বলে কোনো কথা নেই। বৈদ্যুতিক বাতি সফলভাবে জ্বালানোর আগ পর্যন্ত ওই সব একেকটি চেষ্টা ছিল একেকটি পথ। হতাশা আমাকে গ্রাস করেনি।’ না, হতাশা কখনোই অধ্যবসায়ী আর পরিশ্রমী মানুষকে গ্রাস করতে পারে না। তেমনি টিম লিকেও থমকে দিতে পারেনি হতাশা। অনেকে মনে করেছিল, কোনোভাবেই টিমের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না। আর যদি হয়ও, তাহলে এটা জনপ্রিয়তা পাবে না। খুব কমসংখ্যক বন্ধু তাঁর স্বপ্নকে সমর্থন করত। তবু বন্ধুদের তুমুল সমালোচনায়ও হাল ছাড়েননি টিম লি। স্বপ্নের প্রতি ছল তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা। স্বপ্নের সমান শ্রম ছিল তাঁর আদর্শ। এবং নিরলস সাধনায় তিনি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন।

সাদামাটা জীবন তাঁর

ইতিমধ্যে বয়সের ঘর থেকে ৫৫টি বছর মুছে মিশে গেছে তাঁর ফেলে আসা অতীতে। কিন্তু ভবিষ্যতের আবিষ্কারককে বর্তমানে দেখলে তরুণই লাগে। মানুষটিকে দেখলেই বোঝা যাবে, বিলাসপ্রিয় মানুষ নন তিনি। ‘বর্ষসেরা তরুণ নেতা’, ‘নাইট কমান্ডার’, ‘মহা ব্রিটন’ নানা উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ ১০০ ব্যক্তির নামের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায় টিম লির নাম ছিল। ২০০৭ সালে দ্য টেলিগ্রাফ জীবিত ১০০ বুদ্ধিজীবী মহামনীষীর একটি তালিকা তৈরি করে। আলবার্ট হফম্যানের সঙ্গে যুগ্মভাবে তিনি সে তালিকায় প্রথম হয়েছিলেন। কিন্তু সাদাসিধে পোশাক আর সাদামাটা জীবনই ভালো লাগে তাঁর। ‘কী অর্জন করেছি সেটা আমার কাছে মুখ্য বিষয় নয়, আমি কত কিছু না-করা থেকে নিজেকে স্বেচ্ছায় এড়িয়ে রেখেছি সেটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ তাঁর এই কথা থেকেই উঠে আসে তিনি কতটা স্বচ্ছ আর শান্ত জীবন যাপনে অভ্যস্ত।

ভালো-মন্দের মানদণ্ড মূল্যবোধ

ওয়েবের ভালো দিকের পাশাপাশি মন্দ দিকও হয়তো আছে। এবং সেটা ব্যবহারকারীর ওপর নির্ভর করে। নিউক্লিয়ার শক্তির অপপ্রয়োগের জন্য যেমন আলবার্ট আইনস্টাইনকে দায়ী করা যাবে না, ঠিক তেমনি ওয়েবের অপব্যবহারের জন্যও টিম লি দায়ী হবেন না। এ বিষয়ে টিম লি বলেন, ‘সময়ের বিবর্তনে এটা স্পষ্ট হবে। প্রযুক্তির ভালো-খারাপ দুই দিকই আছে। ওয়েবের ভালো-মন্দ নির্ভর করে আমাদেরই ওপর। মূলত আমরা কীভাবে এটা ব্যবহার করি, কীভাবে আমরা শিশুদের শেখাচ্ছি বা আমাদের মূল্যবোধ কেমন তার ওপরই নির্ভর করে ওয়েব ভালো না মন্দ।’

যে পথে কেউ হাঁটেনি

অনেক পথই তো ছিল যে পথে হাঁটতে পারতেন টিম লি। এখন তিনি সচ্ছল মানের একটা নির্ধারিত পারিশ্রমিকে জীবন যাপন করছেন। কিন্তু ওয়েব আবিষ্কারের দরুন বিশেষ কোনো সুযোগ গ্রহণ করছেন না। কেন? যে পথে সবাই হাঁটে সে পথে হাঁটতে চাননি টিম লি।

আর কী চাই তাঁর?

টিম লি বিয়ে করেছেন ন্যান্সি কার্লসনকে। তাঁদের এখন দুই সন্তান। নিজেকে কখন সবচেয়ে সুখী বলে মনে হয় টিম লির? তিনি বলেন, ‘আমি যখন আমাকে হারিয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করি তখনই নিজেকে সবচেয়ে সুখী মনে হয়।’ এখন তাঁর অধিকাংশ সময় কাটে ওয়েবের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনায়। তার চেয়ে বড় ভাবনা তাঁর ওয়েবের স্বাধীনতা নিয়ে। টিম লি চান না, কোনো প্রতিষ্ঠান বা কেউ কখনো এই ওয়েবের মালিকানা হাতে নিয়ে বিশ্বের মানুষকে একই বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে বঞ্চিত করুক। এ জন্যই তিনি এখনো ওয়েবের জন্য কোনো প্যাটেন্ট নেওয়ার পরিকল্পনা করেননি! বর্তমানের বাণিজ্যিক বিশ্বে বিরল এর্টি ঘটনা এটি। টি লি বলেন, ‘আমি চাই সব মানুষ এক হোক।’