রোবেরতো বোলানিও

শেষ সাক্ষাৎকারে রোবেরতো বোলানিও
– লেখক না হলে গোয়েন্দা হতাম
লাতিন আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক রোবেরতো বোলানিওকে বলা হয় বোর্হেসের যোগ্য উত্তরসূরি। রোবেরতো বোলানিওর জন্ম ১৯৫৩ সালের ২৮ এপ্রিল চিলির সান্তিয়াগোতে। বাবা ছিলেন ট্রাকচালক আর মা স্কুলশিক্ষিকা। ১৯৬৮ সালে তাঁদের পরিবার মেক্সিকো সিটিতে চলে যায় জীবিকার অন্বেষণে। বোলানিওর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন, যুক্ত হন বাম রাজনীতির সঙ্গে। চিলির প্রেসিডেন্ট সালবাদর আয়েন্দের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার জন্য বোলানিও ১৯৭৩ সালে চিলিতে ফিরে আসেন আর সে বছরই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থনপুষ্ট জেনারেল পিনেশে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন আয়েন্দে। ব্যাপক ধরপাকড়ে বোলানিও গ্রেপ্তার হন। পরে ছাড়া পেয়ে আবার মেক্সিকোতে ফিরে যান। ওখানে কয়েকজন কবিকে সঙ্গে নিয়ে ‘মোবিমিয়েন্তো ইনফ্রার রিয়ালিস্তা’ নামক কাব্য-আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁদের আরাধ্য ছিল বিট জেনারেশন। খ্যাতনামা মেক্সিকান কবি ওক্তাবিও পাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁরা। বোলানিও ছিলেন কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: রোমান্টিক ডগ (কবিতা), স্যাভেজ ডিটেকটিভ, আমুলেট, বাই নাইট ইন চিলি, লাস্ট ইভনিংস অন আর্থ, দ্য ইনসাফারেবল গাউশো, দ্য সিক্রেট ইভিল, বিটুইন প্যারানথিসিস ও ২৬৬৬। ২০০৩ সালের ২৮ জুলাই বার্সেলোনায় বোলানিও মারা যান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫০। তাঁর শেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় প্লেবয় মেক্সিকো পত্রিকায় সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মনিকা ম্যারিস্টেন। পরে সেটি রোবেরতো বোলানিও: দ্য লাস্ট ইন্টারভিউ অ্যান্ড আদার কনভারসেশন বইয়ে স্থান পায়। ওই সাক্ষাৎকারের একটি অংশ এখানে পত্রস্থ করা হলো। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন দিলওয়ার হাসান প্রশ্ন: আপনি লেখক না হলে কী হতেন? বোলানিও: লেখক হওয়ার চেয়ে আমি খুনখারাবি তদন্তের গোয়েন্দা হতে বেশি আগ্রহ পোষণ করতাম। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কোথাও হত্যাকাণ্ড-টাণ্ড ঘটলে সিধে পৌঁছে যেতাম অকুস্থলে, হোক সে রাত কিংবা দিন ভূতটুতের ভয় না করেই। হয়তো সে সময় সত্যিকার একটা উন্মাদনা কাজ করত। প্রশ্ন: শত্রুদের মুখ থেকে বিস্তর সমালোচনা শোনার পর কি আপনার কি অনুভূতি হতো? বোলানিও: কান্না পেত ভীষণরকম, খিদে মরে যেত, কম সিগারেট খেতাম, খেলাধুলায় মগ্ন হতাম, হাঁটতে যেতাম সমুদ্রের পাড়ে; ওই জায়গাটা ছিল আমার বাড়ি থেকে ৩০ মিটারেরও কম দূরে আর গাঙচিলদের প্রশ্ন করতাম, যাদের পূর্বপুরুষেরা মাছ খেত আর তারা খেত ইউলিসিস: আমি কেন সমালোচনার বাণে বিদ্ধ হব, কেন? আমি তো তোমাদের কোনো ক্ষতি করিনি! প্রশ্ন:কোন পাঁচটি বই আপনার জীবনে গেঁথে আছে? বোলানিও: সত্যি কথা বলতে কী ওই পাঁচ বই পাঁচ হাজার বইয়ের চেয়েও বেশি কিছু। বর্শার ডগার মতো নামগুলো কেবল বলে যাই: দোন কিহোতে—সের্বান্তেস; মবি ডিক—মেলভিল। বোর্হেসের রচনা সমগ্র, হপসকচ—কোর্তাসার, আ কনফিডেরাসি অব ডান্সেস—টুলি। আরও কয়েকখানা বইয়ের নাম করতে চাই: নাজদা—ব্রেতোঁ, দ্য লেটার্স অব জাক ভাস, এনিথিং উবু—জারি, লাইফ: আ উয়ুজার্স ম্যানুয়াল—পার্সি, দ্য ক্যাসেল ও দ্য ট্রায়াল—কাফকা, আফোরিজমস—লিশটেনবার্গ, দ্য ট্রাকটাটাস—উইটজেনস্টেন, দ্য ইনভেনশন অব মোরেল—বিঅয় ক্যাসারেস, দ্য স্যাটাইরিকন—পেট্রোনিয়াস, দ্য হিস্ট্রি অব রোম—টিটো লিভিও ও পেনসিস—পাস্কাল। প্রশ্ন: কে বেশি প্রিয়জন লেনন, লেডি ডি না এলভিস প্রিসলি? বোলানিও: দ্য পোগুয়েস কিংবা আত্মহত্যা। কিংবা বব ডিলান। বেশ ভালোকথা, ভানটান না করেই বলে ফেলি নামটা—চিরকালের এলভিস প্রিসলি। এলভিস আর তার স্বর্ণ-কণ্ঠ, কাঁধে শেরিফের ব্যাজ, একটা মুসটাং গাড়ি চালাচ্ছেন আর গলাধঃকরণ করেছেন বেশ কিছু পিল… প্রশ্ন: দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরীকে দেখেছেন কখনো? বোলানিও: হ্যাঁ, দেখেছি। সেটা ১৯৮৪ সাল। একটা দোকানে কাজ করতাম। সেদিন ভিড় ছিল না দোকানে, এক রকম ফাঁকাই ছিল বলা যায়—সে সময় এক হিন্দু মহিলা দোকানে ঢুকলেন। তিনি দেখতে ছিলেন রাজকুমারীর মতো, কিংবা তার চেয়েও সুন্দরী। তিনি কিছু পোশাক আর অলংকার কিনলেন। একটা পর্যায়ে এসে আমার মনে হলো, মূর্ছা যাব। তাঁর গায়ের রং ছিল তামাটে, দীর্ঘ কেশ আর তাঁর অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও চমৎকার। যাকে বলে চিরন্তন সুন্দরী। দাম নেওয়ার সময় ভীষণ বিব্রত হলাম। মনে হলো তিনি যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেছেন, আর আমাকে ভাবতে মানা করছেন। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর চলে গেলেন তিনি। জীবনে আর কোনো দিন দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে। কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, তিনি ছিলেন দেবী কালী। ওই হিন্দু মহিলা দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নারীই শুধু ছিলেন না—তিনি ছিলেন—খুবই নম্র আর বিনয়ী প্রশ্ন: মৃত্যুর আগে কী কী করে যেতে চান? বোলানিও: বিশেষ কিছু নয়। প্রথম কথা হচ্ছে—আমি মরতে চাই না। কিন্তু আজ হোক কাল হোক মৃত্যু এসে হাজির হবে। প্রশ্ন: মরণোত্তর কাজ আপনার ভেতর কেমন অনুভূতির জন্ম দেয়? বোলানিও: মরণোত্তর কথাটা শুনলেই রোমান গ্ল্যাডিয়েটরদের (মল্লযোদ্ধা—যারা হিংস্র পশুদের সঙ্গে লড়ত) কথা মনে করিয়ে দেয়; একজন গ্ল্যাডিয়েটর যাকে কখনো পরাস্ত করা যায়নি। অন্তত একজন দরিদ্র মরণোত্তর তাই বিশ্বাস করতে চায়। এটা তাকে সাহস জোগায়…।

স্টিভ জবস

একজন লড়াকু মানুষের উত্থান
রনক ইকরাম
আমি হাল ছাড়ব না, এত সহজে হেরেও যাব না- প্রতিবার যখন জীবন তাকে এনে হাজির করত কোনো নতুন পরীক্ষার সামনে তখন এটাই হতো স্টিভ জবস-এর জবাব। এমন অনেক মানুষের কাহিনীই আমরা জানি, যারা তাদের জীবনের নানা প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে উঠে এসেছেন সাফল্যের শীর্ষে। কিন্তু অ্যাপেল কম্পিউটরসের এর সিইও স্টিভ জবস এদের সবার থেকে একটু আলাদা। প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে নয়, তিনি সাফল্য আর খ্যাতির চূড়ায় উঠেছেন তার প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে নিয়েই। তার একক প্রচেষ্টায় নিছক খালি ভাঁড়ার নিয়ে শুরু হওয়া ‘অ্যাপেল কম্পিউটারস’ আজ মাইক্রোসফট-এর মতো কোম্পানিকে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বর জায়গা দখল করে নিয়েছে। জীবনে বহু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন জবস। কিন্তু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। সমস্যা যত বড়ই হোক নিজেকে বুঝিয়েছেন, ‘আমি হারব না’। সত্যি তিনি হারেননি। কখনো হারেননি। ২০০৪ সালে তার লিভারে এক বিশেষ ধরনের টিউমার ধরা পড়ে। এই টিউমার থেকেই ধরা পড়ে ক্যান্সারের সংক্রমণ। ডাক্তাররা জানান, ‘টিউমার অপারেশন করলে স্টিভ-এর বাঁচার আশা খুবই ক্ষীণ। আবার অপারেশন না করলেও রয়েছে প্রাণসংশয়।’ তখন মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল স্টিভ-এর পৃথিবী। তার নিজের তৈরি করা সাম্রাজ্য একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছিল চোখের সামনে থেকে। শুধু একটাই কথা মনে হচ্ছিল তার, ‘তাহলে কি সব শেষ? সারা জীবনের পরিশ্রম, সব মেহনত কি নিমেষে শেষ হয়ে যাবে? ‘অ্যাপেল’কে বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন আমি দেখেছি তা কি তাহলে আর কোনোদিন সম্পন্ন হবে না?’ তাকে ঘিরে থাকা মানুষের সবাই যখন ভেঙে পড়েছেন, হারিয়ে ফেলেছেন লড়াই করার ক্ষমতা তখনই স্টিভ উঠে দাঁড়ান। সিদ্ধান্ত নেন, হেরে যাওয়ার আগে শেষ একবার অস্ত্র হাতে তুলে নেবেন। লড়ে নেবেন শেষ লড়াইটা। হার বা জিত যা হওয়ার হবে। তবে এটা ছিল স্টিভ-এর জীবনযুদ্ধের ইতিহাসের একটা অধ্যায়।

সব ডাক্তারই যখন তার বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখন স্টিভ বেছে নেন এক বিকল্প চিকিৎসার পথ। ২০০৪ সালে ‘হুইপল প্রোসিডিওর’-এর মাধ্যমে তার টিউমার অপারেশন করেন ডাক্তাররা। কোনো ক্যান্সারনিরোধক প্রয়োগের প্রয়োজনও হয়নি। তবে এতকিছু করেও ক্যান্সারের কামড় আটকানো যায়নি। ততদিনে তার শরীরে থাবা বসিয়ে দিয়েছে ওই মারণ রোগ। এবার একটু একটু করে স্টিভকে ঠেলে নিয়ে যাবে মৃত্যুর দিকে। নিজের জীবনের অন্তিম সত্যিটাকে সঙ্গে নিয়েই স্টিভ এগিয়ে চলা শুরু করেন শীর্ষের পথে। চিকিৎসার জন্য সাময়িক বিরতির পর তিনি ফিরে আসেন অ্যাপেল-এর দুনিয়ায়। নিজের হাতে তুলে নেন সংস্থার দায়িত্বভার। একে একে ‘হার্ডল’ পেরিয়ে অ্যাপেল এগোতে থাকে সাফল্যের চূড়ায়। প্রথম লড়াই তাকে লড়তে হয়েছিল শৈশবেই। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ সালে সান ফ্র্যান্সিসকো-এ জন্ম হয় স্টিভেন পল জবস-এর। অবিবাহিত বাবা-মায়ের সন্তান স্টিভকে দত্তক নেন পল এবং ক্লারা জবস্। স্টিভ- নামটিও তাদেরই দেওয়া। বাবা-মায়ের অভাবে বেড়ে ওঠাই ছিল স্টিভ-এর প্রথম লড়াই। ক্যালিফোর্নিয়ার হোমস্টেড হাই স্কুল-এ লড়াইয়ের শুরু। ক্যালিফোর্নিয়ার হোমস্টেড হাইস্কুল-এ পড়ার সময় স্টিভ একটি সফ্টওয়্যার সংস্থা হিউলেট-প্যাকার্ড কোম্পানিতে কাজ করার সুযোগ পান। সেখানেই হয় তার কর্মজীবনের সূত্রপাত। এরপর ‘আতারি’ নামে একটি সংস্থার হয়ে তিনি ভিডিও গেম তৈরি করেন। তবে এসবই ছিল শুরুর শুরু। ১৯৭৬ সালে স্টিভ তার দুই বন্ধু স্টিফেন ওজনিক, রোনাল্ড ওয়েনকে নিয়ে ‘অ্যাপেল কম্পিউটারস্’-এর সূচনা করেন। না ছিল কোনো ফান্ড, না কোনো পরিকাঠামো। শুধু ছিল অসীম ইচ্ছা। সফল হওয়ার ইচ্ছা। আর এটাই এগিয়ে নিয়ে যায় স্টিভ বাহিনীকে। ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৪ সালে জবস বাজারে আনেন বিশ্বের সবচেয়ে ছোট কম্পিউটার ‘ম্যাকিনটশ’। এর জনপ্রিয়তাই অ্যাপেল-এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সব হয়েও কিছুই হলো না। বাড়ানো গেল না অ্যাপেল-এর বাজারদর। বাড়ল না ক্রেতার সংখ্যাও।

অন্যদিকে বিশ্ব-বাজারে ছেয়ে গেল মাইক্রোসফটের নিত্যনতুন পণ্য। বাজার দখলের লড়াইয়ে অ্যাপেলকে পেছনে ফেলে অনেকটাই এগিয়ে যায় মাইক্রোসফট; কিন্তু তখনও হাল ছাড়েননি স্টিভ। চালিয়ে যেতে থাকেন লড়াই। এগিয়ে যেতে থাকেন চূড়ান্ত সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। তবে সাফল্যের রাস্তা একাকী। সেই রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে মানুষ অনেক সময়ই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। স্টিভও হয়েছিলেন। তার মনের মুক্তি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বৌদ্ধধর্মের মধ্যে। সেই টানে তিনি ছুটে এসেছিলেন এই ভারতের মাটিতেও। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন নিজ দেশে। আজীবন নিজের ভাগ্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন স্টিভ। কখনো বাবা-মা ছাড়া বাঁচার জন্য, কখনো অ্যাপেলকে পরিচিতি দেওয়ার জন্য, কখনো বা নিজের মৃত্যুকে আটকানোর জন্য- নিরন্তর লড়াই করেছেন। আজও লড়ছেন। যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন লড়বেন। আর তার এই লড়াই গোটা বিশ্বের মানুষকে জোগাচ্ছে বাঁচার ইচ্ছা। স্টিভ আমাদের দেখিয়েছেন, যারা লড়াই করেন তারা কখনো হারেন না। আর এই পৃথিবী শুধু জয়ীদেরই স্যালুট করে।

নেলসন ম্যান্ডেলা

নিজের সুযোগ নিজেই তৈরি করো

নেলসন ম্যান্ডেলা
বিশ্বের বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা। বর্ণবাদ-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি। আফ্রিকানরা তাঁকে ‘মাদিবা’ বলে ডাকে। বিভিন্ন সময় মোট ২৭ বছর কেটেছে কারাগারে। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ১৯৯৩ সালে। এ বছর ১৮ জুলাই তিনি ৯২-এ পা রাখবেন। ১৯৯৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার যুব দিবসে তরুণদের উদ্দেশে উৎসাহব্যঞ্জক এক বক্তব্য দেন ম্যান্ডেলা।

আজও স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে চোখে। কোমলমতি তরুণদের নিথর দেহ পড়ে আছে পথে পথে। পুলিশের বন্দুকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে অসংখ্য তরুণের তাজা তাজা প্রাণ। পুরো দক্ষিণ আফ্রিকা সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। এই স্মৃতিগুলো আমাদের তাড়া করে আর মনে করিয়ে দেয়, কেমন এক বিভীষিকাময় অন্ধকার ভয়ংকর অতীতকে আমরা জয় করেছি। এই স্মৃতিগুলো বারবার করে বলে তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। কারণ, তরুণদের আত্মত্যাগেই মিলেছে আমাদের মুক্তি, আমাদের স্বাধীনতা। আমরা এখন কত না আনন্দিত। কারণ, আর কোনো বুলেট কোনো তরুণের গায়ে লাগবে না। আমাদের তরুণেরা এখন শিক্ষার ভালো পরিবেশ চায়। তারা চায় ভালোভাবে জীবনটাকে উপভোগ করতে।
আমরা এই দিনে সমবেত হয়েছি শুধু তরুণদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে। কেননা বর্ণবৈষম্যের বিষদাঁত ভেঙে তরুণেরাই তো আমাদের মুক্তি এনে দিয়েছে। বর্ণবৈষম্যবিরোধী বিপ্লবের সামনে থেকে তারা নেতৃত্ব দিয়েছে। মুক্তি বা স্বাধীনতা যখনই হাতছানি দিয়ে ডেকেছে, তখনই তোমরা তরুণেরা সাড়া দিয়েছ। মৃত্যুকে পরোয়া না করে, বরং তুচ্ছ বলে বুলেটের আঘাতকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছ। বিপ্লবের মাঠ থেকে তোমরা কখনোই পিছপা হওনি। একটি গণতান্ত্রিক ও বিকল্প জাতি গঠনের আহ্বানে তোমরা সাড়া দিয়েছ।
তোমরা এসব করেছ নিজেদের জন্য, জাতির জন্য। অথচ বিনিময়ে তোমরা বিশেষ কোনো সুবিধা চাওনি। এমনকি আজও চাইছ না। কিন্তু আজ আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলতে চাই, এই জাতি তরুণদের কাছে ঋণী। তাই জাতি তোমাদের গণতন্ত্রের সব ধরনের সুবিধা দিতে নতুন করে একটি জাতীয় যুব কমিশন গঠন করছে। শুধু তরুণদের জন্য এই কমিশন কাজ করবে। তরুণদের চাহিদার জোগান আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে এ কমিশনের কাজ। তরুণেরা যেমন জাতির জন্য নিবেদিতপ্রাণ, তেমনি জাতিরও কিছু দায়িত্ব থাকে। তরুণেরা যেন জাতি গঠনে ও জাতির উন্নয়নে সক্রিয় অংশ নিতে পারে, সেটা নিশ্চিত করবে জাতি। আশা করি, এই কমিশন সব বাধা পেরিয়ে সফলভাবেই কাজ করতে পারবে। তবে কমিশনের সফলতা নির্ভর করবে তরুণদের ওপরই। তোমাদের সহযোগিতা ছাড়া এই কমিশন সফল হতে পারবে না। তোমাদের সহযোগিতা ছাড়া জাতিও সফল হতে পারবে না। কারণ, তোমরা তরুণেরাই জাতির কর্ণধার।
আমরা ঋণী তরুণদের কাছে, যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে জাতির জন্য। যারা আত্মবিসর্জন দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের জন্য, যেন সবাই উন্নত ও সুখী জীবনযাপন করতে পারে। ২০ বছর আগের সেই দিন, ১৬ জুন ১৯৭৬। ঘুমন্ত জাতিকে তোমরা তরুণেরা সেদিন জাগিয়ে তুলেছিলে। তখন বর্ণবৈষম্যের শাসনব্যবস্থায় কালোরা ছিল ক্রীতদাস। তোমরা সেই তরুণ, যারা সেদিন নিজেদের প্রাণ দিয়ে দাসত্ব থেকে জাতিকে এনে দিয়েছিলে মুক্তি। বর্ণবৈষম্যের পতন ঘটিয়ে তোমরা বদলে দিয়েছ ইতিহাসের গতিধারা।
আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দারিদ্র্যকে জয় করা। গৃহহীনদের আবাসনের ব্যবস্থা করা। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন অশিক্ষা আর অজ্ঞানতাকে জয় করা। পৃথিবীটা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। আমাদের দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। উদ্ভাবনের দিকে আমাদের উন্নতি করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদন করতে হবে এবং এসব চ্যালেঞ্জ আসলে তরুণদেরই মোকাবিলা করতে হবে। যখন শহর আর গ্রাম থেকে তোমরা প্রকৌশলী, পদার্থবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও অন্যান্য বিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এই সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বাড়বে, তখনই আমরা বলতে পারব, আমরা উন্নতি করছি। এ জন্য যত ধরনের সুযোগ-সুবিধা তোমরা পাবে, তা ঠিকঠাকভাবে কাজে লাগাবে।
জাতির জন্য চাই কর্মঠ ও পরিশ্রমী তরুণ। দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে তরুণদের ওপর, তোমাদের ওপর। তোমরাই পারো, তোমাদের কঠোর পরিশ্রম আর প্রচেষ্টায় নিজ জাতিকে সবচেয়ে সফল, সুখী ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে। জাতি গঠনের এ লক্ষ্যটা পূরণ করতে তোমাদের কাজ করতে হবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহভাগিতার মানসিকতা নিয়ে।
যেসব তরুণ কাজ জোটাতে পারোনি, তাদের বলি, তোমরা হতাশ হোয়ো না। সুযোগকে কাজে লাগাতে শেখো। বড় হোক ছোট হোক, কাজে যোগ দাও। শুধু শুধু অন্যের ওপর নির্ভর কোরো না। নিজেই নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। নিজের জন্য নিজেই সুযোগ তৈরি করো। সরকারের দেওয়া ছোট কোনো কাজ, হতে পারে সেটা কৃষিকাজ, তুমিও যোগ দাও।
আমার বিশ্বাস, দেশের সব মানুষই বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্যহীন জাতি গঠনে একযোগে কাজ করবে। আমি জোরালো প্রত্যাশা করি তরুণদের কাছ থেকে। বৈষম্যহীন জাতি গঠনের স্বপ্নটাকে সত্যি করতে তোমরা প্রাণ উজাড় করে কাজ করবে। সব যুবক যদি এক হয়, সব মানুষ যদি এক হয়, তবে দেশে এমন একটা পরিবেশ গড়ে উঠবে, যেখানে সবাই মিলে সুখে-শান্তিতে বাস করা যায়।
তরুণেরা আমাদের অহংকার, তরুণেরা একটা জাতির অলংকার। তরুণেরা দুঃসাহসের প্রতীক। তাদের বীরত্বকে ভোলা যায় না। সংগ্রামী তরুণদের জন্য আমরা গর্বিত। আজকের দিনে প্রতিটি জাতির জন্য এমন দুঃসাহসিক বীর যুবকের আরও বেশি প্রয়োজন। তোমরা সাহসী হও। শেখায় মনোনিবেশ করো। নিজেদের দক্ষতা বাড়াও। মতৈক্য গড়ে তোলো। জাতির ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতেই। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তোমরা তোমাদের জাতির ভবিষ্যৎটাকে উজ্জ্বল করো, আলোকিত করো। তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

মৌসুমি

সফল নারী হয়ে ওঠার গল্প
পিছিয়ে থাকার সময় অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তাইতো আমাদের নারীরা আজ সাফল্যের পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে অনেক শ্রমের গল্প। বিশ্ব নারী দিবসকে সামনে রেখে আমাদের শোবিজ জগতের খ্যাতিমান কয়েকজন নারীর সফল হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে এবারের মূল ফিচার লিখেছেন রকিব হোসেন।

নারী শব্দটি উচ্চারণ করতেই আমরা সবাই নাড়ির টান অনুভব করি। নারী মানে একজন মা, কন্যা, বোন আরো অনেক সম্পর্কের বন্ধন। আর এই সম্পর্কের মাঝে আছে অনেক মধুরতা, আবেগের মাখামাখি আরো আছে আনন্দ, সুখের অনেক কাব্য। এক সময় নারী অভিধানে অবহেলিত, অসহায়ত্ব এই শব্দগুলো খুব মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেও এখন আর সেখানে এই শব্দগুলো খুব দুর্বল চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশের নারীরাও নিজেদের সাফল্যের গল্প রচনা করেছেন অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে। তেমনি আমাদের শোবিজ জগতের নারীদের সাফল্য গাঁথাও চোখে পড়ে বড় করে। এই জগতের বাসিন্দাদের অনেকেই আজ নিজের কর্ম দিয়ে নতুন প্রজন্মের মাঝে আদর্শ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের মিডিয়ায় আলোচিত নারীদের মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় খ্যাতিমান চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও পরিচালক কবরী’র কথা। বরেণ্য পরিচালক সুভাষ দত্তের হাত ধরে ১৯৬৪ সালে চলচ্চিত্রে আসেন মিষ্টি মেয়ে কবরী। প্রথম ছবি ‘সুতরাংম্বএ তার অভিনয় দর্শক মনে আলোড়ন তোলে। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু সাফল্যের সঙ্গে সামনে এগিয়েছেন তিনি। এক সময় নায়ক রাজ-রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি হয়ে কাজ করে তিনি তৈরি করেছেন সাফল্যের নতুন এক ইতিহাস। শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তার উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে- ময়নামতি, বধূ বিদায়, কখগঘঙ, অধিকার, সারেং বৌ, দ্বীপ নেভে নাই, আবির্ভাব, দুই জীবন, অনির্বাণ, স্মৃতিটুকু থাক, সুজন সখি। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র আয়না একটি বিশেষ শ্রেণীর দর্শকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। চলচ্চিত্র এবং টিভি নাটক দুই মাধ্যমেই তিনি কাজ করছেন সাফল্যের সাথে। অবশেষে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাফল্যকে মুঠোবন্দী করেছেন তিনি।

ষাটের দশকের শুরুতে এক্সট্রা শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন শাবানা। এভাবে কয়েকবছর কাটানোর পর ১৯৬৭ সালে চকোরি ছবিতে তার সুযোগ হয় নায়িকা চরিত্রে কাজ করার। প্রথম ছবিতেই সাফল্যের বাতায়ন খুলে দেন শাবানা। তারপর ভাত দে, অবুঝমন, মাটির ঘর, মধুমিলন, সকাল সন্ধ্যা, সখিনার যুদ্ধ, সখি তুমি কার, অস্বীকার, মরণের পরে, পিতামাতা সন্তান প্রভৃতি ছবিতে শাবানা নিজের অভিনয় প্রতিভাকে তুলে ধরেছেন শক্ত করে। তিনি বলতেন, এফডিসি তার দ্বিতীয় সংসার।

শুধু দেশে নয়, চিত্র নায়িকা ববিতার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে বিদেশেও। জহির রায়হানের হাত ধরেই তার অভিনয় জীবন শুরু হয়। প্রথম ছবিতে তিনি কিশোরী চরিত্রে কাজ করেছেন। নায়িকা হয়েছেন দ্বিতীয় ছবি ‘শেষ পর্যন্ত’এ। আর এ ছবির মাধ্যমেই তার সাফল্যের যাত্রা শুরু। ববিতা অভিনীত দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে অস্বনী সংকেত, সুন্দরী, কসাই, গোলাপী এখন ট্রেনে, স্বরলিপি, টাকা আনা পাই, নয়ন মনি ইত্যাদি। অভিনয় স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার। ববিতা বলেন, ‘আমার যেকোনো কাজের সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিতাম। সব সময় চেষ্টা করেছি যে কাজটি করছি তা সততার সঙ্গে করতে। আমি যা কিছু পেয়েছি তার পেছনে ছিল আমার ডেডিকেশন, ডিসিপ্লিন, ডিটারমিনেশন। আমি মনে করি জীবনে সাফল্য পেতে হলে এগুলোর খুবই প্রয়োজন।’ কবরী, শাবানা ও ববিতার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে মডেলিং দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করে ছিলেন মৌসুমী। এরপর প্রথম ছবি কেয়ামত থেকে কেয়ামত-এ অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে যান তিনি। তার অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- দেন মোহর, স্নেহ, বিদ্রোহী বধূ, মেঘলা আকাশ, গৃহ বধূ, খায়রুন সুন্দরী।’ চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মৌসুমী কাজ করেছেন টিভি নাটকেও। এখানেও সাফল্য তার পিছু নিয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও মৌসুমী পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মৌসুমী বলেন, ‘আমি একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ। আর এই আত্মবিশ্বাসে ভর করেই কাজ করেছি। পাশাপাশি এর সাথে ছিল মেধা ও পরিশ্রম। সংসারও সামলিয়েছি সফলতার সঙ্গে। এ কারণে ব্যক্তিজীবনে আমি একজন সুখী মানুষ। আজকের এ অবস্থানে এসে আমার যে উপলব্ধি হয়েছে তা হলো একজন নারী চাইলেই সবকিছু ঠিক রেখে সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে।

চলচ্চিত্র তারকাদের মতো আমাদের নাটকের শিল্পীরাও সাফল্য দিয়ে নিজেদের নির্মাণ করেছেন নিপুণভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বড় ভাই মুনির চৌধুরীর উৎসাহে মঞ্চ নাটকের অভিনয় শুরু করেন ফেরদৌসী মজুমদার। তিনি বিটিভির প্রথম নাটক ‘একতলা-দোতলা’র অভিনেত্রী। তার অভিনীত মঞ্চ নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কোকিলারা (একক নাটক), পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, ম্যাকবেথ, ওথেলো, মেরাজ ফকিরের মা, দুই বোন প্রভৃতি। টিভি নাটকের মধ্যে রাহু, সংশপ্তক, আমি তুমি সে, আশ্রয়, বরফ গলা নদী, অকূল দরিয়ার বাঁক ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছেন। বেশকটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন ফেরদৌসী মজুমদার। এরমধ্যে দমকা, মায়ের অধিকার, বিহঙ্গ উল্লেখযোগ্য। সংসার ও কর্মজীবনে সফল মানুষ ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, ‘সংসার ও কর্মজীবন দু’ মাধ্যমের কাজের প্রতি আমি সবসময় সচেতন ছিলাম। একটির কারণে অন্যটির যেন কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে আমি সজাগ থেকেছি। আমি আজ যে অবস্থানে এসেছি তা সম্ভব হয়েছে কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সততা, পেশাদারিত্ব ও ভালোবাসার কারণে। কাজের প্রতি কখনো বিরক্তি হয় নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে কাপড় ধুয়েছি, স্কুলে গিয়েছি এরপরও আবার শুটিং করেছি। ঘুমিয়েছি চার-পাঁচ ঘণ্টা। মনপ্রাণ উজাড় করে কাজ করেছি। এজন্য প্রশংসিতও হয়েছি। আমার কোনো আক্ষেপ নেই।’ জহির রায়হানের বরফ গলা নদী নাটকের মাধ্যমেই অভিনয় জীবন শুরু করেন সুর্বনা মুস্তাফা। প্রথম নাটকেই মেধার বিচ্ছুরণ ঘটান তিনি। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকের মধ্যে রয়েছে- বরফ গলা নদী, চেহারা, ইডিয়ট, কূল নাই কিনার নাই, তবুও জীবন, আকাশ কুসুম, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার, সংশপ্তক ইত্যাদি। টিভি নাটকের পাশাপাশি মঞ্চেও সুবর্ণা মুস্তাফা তার অভিনয় দক্ষতা মেলে ধরেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য মঞ্চ নাটকগুলো হলো- শকুন্তলা, মুনতাসীর ফ্যান্টাসী, কীত্তনখোলা, হাত হদাই, বন পাংশুল, যৈবতী কন্যার মন প্রভৃতি। এছাড়া চলচ্চিত্রেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন সুবর্ণা মুস্তাফা। ঘুড্ডি, লাল সবুজের পালা, নতুন বউ, শঙ্খনীল কারাগার, নয়নের আলো ইত্যাদি ছবিতে আমরা পেয়েছি ভিন্ন ভিন্ন সুর্বণা মুস্তাফাকে।

গান দিয়ে দেশীয় নারী শিল্পীদের সফলতার গল্পটা রচনা করার ইতিহাস অনেক পুরনো। তখন বয়স নয়। এ বয়সেই প্রথম প্লেব্যাকে কণ্ঠ দেন সাবিনা ইয়াসমিন। এরপর তিনি একচেটিয়া কাজ করেছেন দেশীয় প্লেব্যাকে। সুরের ইন্দ্রজালে মাতিয়েছেন দেশ-বিদেশের কোটি কোটি দর্শক। তার কণ্ঠে দেশের গান পেয়েছে নতুন মাত্রা। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ একাধিক জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই গুণী শিল্পী। সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, গানটাকে সব সময়ই সাধনার বিষয় বলে জেনেছি। কাজ করেছি শতভাগ আন্তরিকতা নিয়ে। এ কারণে ভালোবাসা পেয়েছি কোটি শ্রোতার। কেউ যদি শতভাগ সততার সঙ্গে কাজ করে, সাফল্য তার মুঠোবন্দী হতে বাধ্য।

লুলা দা সিলভা

টাইম সাময়িকীর চোখে শীর্ষনেতা

মুচি থেকে মহানেতা

সিদরাতুল সিনড্রেলা | তারিখ: ১৯-০৫-২০১০

দরজায় হেলান দিয়ে কাঁদছেন ২৫ বছরের অসহায় এক যুবক। ১৯৭১ সাল। তাঁর সামনে নিথর পড়ে আছে লক্ষ্মী বউয়ের লাশ। আট মাসের বাচ্চা পেটে ছিল বউটির। না, ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়। যুবকটি ব্রাজিলের। হেপাটাইটিসের চিকিৎসার অভাবে ঘরের লক্ষ্মীর অকালমৃত্যু। অপরাধবোধের ঘোর অন্ধকার ছেয়ে ফেলে তাঁকে। জেদ চাপে মনে, একদিন অনেক বড় হবেন, যেদিন এভাবে কাউকে অর্থের অভাবে মরতে হবে না। বেছে নিলেন রাজনীতির পথ। তিনি আজ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট, লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা! সম্প্রতি টাইম সাময়িকীর বর্ষসেরা শত মনীষীর তালিকায় শীর্ষনেতা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

জন্ম ১৯৪৫ সালে। বয়সের ঘর থেকে মুছে গেছে তাঁর ৬৪টি বছর। কিন্তু মুছে যায়নি শৈশব-কৈশোরের কষ্টের স্মৃতিগুলো। তিনি প্রথম পড়তে শেখেন ১০ বছর বয়সে। এরপর চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সাত বছর বয়সে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর সংসারের আয়রোজগারের দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। বন্ধুরা যখন স্কুলে, ১৪ বছরের কিশোর লুলা দা সিলভা তখন রাস্তার মোড়ে বসে আছে রং-পলিশ নিয়ে। কী কাজ তাঁর? পথচারীর জুতা পলিশ। আজকের ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা সেদিন ছিলেন রাস্তার মুচি! কিন্তু এই কাজে কত আর আসে? তাতে তো আর সংসার চলে না। কাজ নিলেন লেদ ফ্যাক্টরিতে। একদিন কাজ করতে গিয়ে তাঁর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের অর্ধেকাংশ কেটে গেল। কাটা আঙুল নিয়ে দৌড়ে গেলেন আশপাশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য। ঝরঝর করে রক্ত ঝরছে। কিন্তু সামান্য শ্রমিকের কথা কে শোনে! বিনা পয়সায় তো আর চিকিৎসা হয় না! এই ঘটনা তাঁকে প্রচণ্ড রকম নাড়া দেয়। তাঁর ইচ্ছে হলো, শ্রমিকদের নিয়ে একটা সংঘ গড়ে তুলবেন। এই ইচ্ছেটাই শেষে জেদে পরিণত হয়, যখন বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন তাঁর স্ত্রী মারিয়া। এরপর বড় ভাইয়ের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। ২৭ অক্টোবর, ২০০২। সেদিন তাঁর ৫৭তম জন্মদিন। চারদিকে আনন্দ-আড্ডার আয়োজন। হাজার হাজার মানুষের শুভকামনায় সিক্ত তিনি। না, জন্মদিনের আয়োজন বা শুভকামনা নয়, তিনি নির্বাচিত হয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট! ২০০৬ সালে তিনি দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আর সে জন্যই টাইম সাময়িকী তাঁকে নির্বাচন করেছে ২০১০ সালের সেরা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। একজন সাধারণ মুচি থেকে মহানেতা! নিশ্চয়ই লুলা দা সিলভা বিশ্বের সব তরুণের এক আদর্শ অনুপ্রেরণা হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

বেনজির ভুট্টো

আত্মবিশ্বাসী মানুষই সফল হয়
—বেনজির ভুট্টো | তারিখ: ২৭-১০-২০১০

বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। বেনজির ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত অক্সফোর্ডের লেডি মার্গারেট হল থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেন। এলএমএফ শেষে অক্সফোর্ডের সেন্ট ক্যাথরিন কলেজ থেকে ডিগ্রি নেন তিনি এবং এশিয়ার প্রথম নারী হিসেবে ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন বিতর্ক সোসাইটি’র সভাপ্রধান নির্বাচিত হন।
২৭ ডিসেম্বর, ২০০৭ রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৫৩ সালের ২১ জুন পাকিস্তানের করাচিতে তাঁর জন্ম।

আমার বাবা ছিলেন আমার সারা জীবনের অনুপ্রেরণা। আমি যখন আমার পুরোনো দিনগুলোতে ফিরে তাকাই, দেখি তখন প্রচণ্ডভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে ব্যবধান ছিল, নারীদের প্রতি চরম বৈষম্য প্রকটভাবে উপস্থিত ছিল। আর বাবা ছিলেন সব সময়ই এর বিরুদ্ধে। আমার মা ছিলেন সব ক্ষেত্রে পারদর্শী একজন নারী। করাচির রাস্তায় তিনি ছিলেন প্রথম একজন নারী, যিনি একা গাড়ি নিজেই চালাতেন। কিন্তু মা শেখাতেন, একজন নারী বিয়ে আর সন্তান জন্ম দেওয়া ও লালন-পালনের জন্যই তৈরি হয়। মা বাবাকে বলতেন, কেন তুমি ওকে পড়াশোনা শেখাচ্ছ? কোনো পুরুষই তো আর তাকে বিয়ে করবে না। সেই সময়ে মায়ের কাছে নারীর সফলতা মানেই ছিল, কীভাবে সে একজন ভালো স্বামী পেতে পারে, সন্তান বড় করতে পারে। অথচ আমার বাবা এসব কিছুকে পাত্তাই দিতেন না। উল্টো সব বাধা ভেঙে দিয়ে আমার উচ্চশিক্ষার জন্য সর্বদা সচেষ্টা থেকে গেছেন। বাবা বলতেন, ‘ছেলে ও মেয়ে সবাই সমান, আমি চাই আমার মেয়ে সেই সব সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে, যা একজন ছেলেকে দেওয়া হয় এবং যা মেয়ে হিসেবে ওর প্রাপ্য।’
বাবাকে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি, কেন তিনি এমনটা ভাবতেন। আমার সুযোগ হয়নি সেটা জানার। বিশ্ববিদ্যালয় শেষে আমি যখন ফিরে এসেছিলাম তখন তিনি জেলে ছিলেন অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে, ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। আমার এক বান্ধবী ছিল, যার বাসায় আমি প্রায়ই যেতাম—তারা তাদের ভাইয়ের খাওয়া শেষ না হলে খেতে পেত না। তাদের খাওয়া হলে পড়ে থাকা এঁটো খাবার বাড়ির মেয়েরা খেত। আমাদের বাড়িতে তেমনটা কখনোই হতো না। আমি টেবিলের প্রধান আসনে বসতাম, কারণ আমি পরিবারের বড় ছিলাম। বাবা আমাকে এটা শেখাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে মেয়েরা কোনোভাবেই পৃথিবীর হেয়প্রতিপন্ন প্রাণী নয়।
আমাকে জীবন সম্পর্কে আরও শিখিয়েছিলেন আমার নানরা। ছোটবেলায় আমি পড়তাম মিশনারিজ স্কুলে—কভন্যান্ট অব জোসেফ অ্যান্ড ম্যারি। মনে আছে, ‘মাদার ইউজিন’ আমাকে নিয়ে যেতেন সাহিত্য আর কাব্যের জগতে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন চাঁদ গ্রহপুঞ্জের সঙ্গে। এটা এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল, যে কেউ চাঁদ আর নক্ষত্রকে জয় করতে চাইবে। তাই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষদের তালিকায় আছেন, আমার বাবা এবং মাদার ইউজিন।
আমি ভালো ছাত্রী ছিলাম। আমার বাবা সব সময়ই পড়াশোনার ওপর বেশি জোর দিতেন এবং আমি দেখতাম, তিনি কতটা সন্তুষ্ট হতেন আমার ভালো ফল দেখে। আমি অনেক বেশি পরিশ্রমী ছিলাম এবং সবকিছু খুব ভালোবেসে শিখতে চাইতাম।
‘আমার মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি সেখানে এমন সময়টায় ছিলাম, যখন সেখানকার সমাজে একটা অভাবনীয় বদল লেগেছিল। এমন একটা সময়, যখন ভিয়েতনাম-যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আমি যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিপক্ষে ছিলাম এবং আমি দেখেছিলাম, আমার আমেরিকান সহপাঠীরাও এ যুদ্ধের তীব্র বিপক্ষে ছিল। তারা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে নেমেছিল। আমি শিখেছি, যদি তুমি কোনো কিছুকে না সমর্থন করো, তাহলে তা রুখতে তুমিই ভূমিকা রাখতে পারো। আমি সে সময়টায় দেখেছি রবার্ট কেনেডি, মার্টিন লুথার কিংকে এবং দেখেছি আদর্শবাদকে, সিজার শাভেজ এবং শ্রম অধিকার নিয়ে আন্দোলনকে। তাই আমি ছিলাম পৃথিবী, সমাজ ও মানুষকে বাঁচানোর দলে। তখন সবাই এই বাঁচানোর দলে প্রাণপণ নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছে। আমরা ভেবেছিলাম, পুঁথিগত শিক্ষার গুরুত্ব নেই। পরীক্ষার কোনো দরকার নেই। যদিও আমি পড়তাম, পরীক্ষা দিতাম, আমার বাবার কথা চিন্তা করে। কিন্তু একটা সময় আমি আবিষ্কার করি পড়াশোনা, বাড়ির কাজ, টিউটোরিয়াল সব বাঁধাধরা গণ্ডি—এসব কিছু ছাড়াও জীবনে আরও অনেক বৃহৎ আলোচ্য বিষয় আছে, ক্ষেত্র আছে, যেখানে আমাদেরই ভূমিকা রাখতে হবে।
তখন নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। কেট মিলেট কেবল তাঁর বই লিখলেন, যা নিয়ে আমরা অনেক আলোচনা করেছি। কথা বলেছি, নারী এবং তাঁর সাফল্য নিয়ে। আমার এক অসম্ভব প্রিয় বন্ধুর কথা মনে আছে—ইউন্ডি লেসার। আমরা অনেক সময় ধরে আলাপ করতাম। কীভাবে নারী সফল হবেন? কীভাবে সে বাধা তাঁরা প্রতিরোধ করবেন? তখন অনেক নারীই মনে করতেন, তাঁদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য পেশা-ভাবনা নয়, বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।
হার্ভার্ড-জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোই আমি পাকিস্তানে নিয়ে আসি আমার সঙ্গে। কেন আমরা আমাদের সরকার কিংবা সরকারব্যবস্থাকে বদলাতে পারব না। আমি দেখেছি, নিক্সনকে কীভাবে ইমপিচ করা হয়েছিল ওয়ারগেট কেলেঙ্কারিতে।
আমি দেখেছি, গণতন্ত্র কতটা ক্ষমতাবান। এটা সত্যিই অনেক প্রভাবশালী। গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে আমি নিজে আমার ক্ষমতাকে অনুভব করতে পারি। আমি জানি, আমার কথাকে মূল্য দেওয়া হবে এবং সবাইকে। এখানে স্থান দেওয়া হয় সবাইকে। আমার বিদেশে উচ্চশিক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে বাবা পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেমে পড়েন। তিনি পাকিস্তানের সব সাধারণ মানুষকে আত্ম-অধিকারে সচেতন করতে চেয়েছিলেন সামন্তবাদের বিরুদ্ধে, সেনা শাসকদের বিরুদ্ধে। আমি যখন পাকিস্তানে ফিরে এসেছিলাম, এসব অভিজ্ঞতাই আমাকে অনেক দূর নিয়ে গিয়েছিল। আমি দেখেছি, গণতন্ত্র কীভাবে সফল হতে পারে, সেটা পাকিস্তান কিংবা আমেরিকা, যেখানেই হোক না কেন।
যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন আমি সব সময় সংঘাত, হানাহানি, রক্তপাত—এসব কিছুর বিরুদ্ধে ছিলাম। পঞ্চাশের দশকে মানুষের বিনোদনই ছিল শিকারে যাওয়া, শিকার করা। একবার আমার বাবা ও ভাইদের শিকারে একটা টিয়াপাখি গুলির আঘাতে মাটিতে আছড়ে পড়ে। আমি তার রক্ত সহ্য করতে পারছিলাম না। হাস্যকর শোনাতে পারে। কিন্তু আমি ওই পাখিটার কথাই ভাবছিলাম, কেন তাকে এমন পরিণতি মেনে নিতে হবে। পরিহাসই বটে—ফাঁসির দণ্ড শোনার পর আমার বাবা বলে উঠলেন, ‘আমার সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে পড়ছে, যে একটা পাখির জন্য কেঁদেছিল। আজ সে কী করবে?’
আমার বাবার মৃত্যুটাও আমাকে অনেকভাবে তৈরি করেছে। আমি আমার বাবার আত্মত্যাগ, সে সময়ে অন্যায়ভাবে নিহত সবার আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দিতে চাইনি। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। শুধু একজন নারী হিসেবে নয়, মাত্র ৩৫ বছরে মুসলিম একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারার তৃপ্তিটা ছিল এমন যে এ বিজয় নারীদের সবখানে। এ জয়ের পর আমার কাছে অনেক নারীর চিঠিও এসেছে—দেশের বাইরে থেকে, দেশের ভেতর থেকে, যে নারী হিসেবে দেশ চালানো ঠিক নয়। আমি জানি না, কেন? এটা আসলেই বিচিত্র মানুষের পৃথিবী। আমার মনে আছে, সেই নারীর কথা, যে বিমানচালক হতে চেয়েছিল। সাক্ষাৎকারে তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ফিরে এসো, যখন আমাদের এখানে একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হবে।’ এ বিজয়ের পর সত্যিই সেই নারী ফিরে গিয়েছিল এবং পাইলট হতে পেরেছিল।
বিতর্ক আরও উঠেছিল। আমার রাজনৈতিক আদর্শও বিতর্কের বাইরে ছিল না। কিন্তু আমি এসব কিছুর সঙ্গে লড়েছি, আমার এজেন্ডাগুলোর সঙ্গে। এজেন্ডাগুলো ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, দারিদ্র্য দূর করার জন্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য। এবং আমরা সফল হয়েছিলাম। সমালোচনাও সব সময় ছিল। কিন্তু আমার প্রথম নির্বাচনের পর আমি শিখেছিলাম, সমালোচনাকে গ্রহণ করতে হয়।
আমি দেখেছি, গণতন্ত্র কতটা ক্ষমতাবান, গণতন্ত্র মানুষের মধ্যে কতটা ক্ষমতা জাগিয়ে দেয়। জীবনে আমাদের অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়, কিন্তু আমি মনে করি, নেতৃত্বই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের ক্ষমতাকে—কতটুকু হারকে মেনে নেব এবং কীভাবে হারকে পরাভূত করব। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতিতে থাকার পর আমি দৃঢ়ভাবে এই উপসংহারে আসি, যে সফল হয় এবং যে হেরে যায়, তাদের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো কে তার সফলতা কিংবা বিফলতাকে কতটুকু গ্রহণ করতে পারে এবং সেখান থেকে ফিরে আসার ক্ষমতা রাখে। কারণ সফল হওয়ার এই অভিযাত্রায়, সেখানে বিপর্যয় থাকবে, হতাশায় মুহ্যমান হওয়া মানুষ থাকবে এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ থাকবে যারা বলবে—না, আমরা এগিয়ে যাব। এটিই বিফলতাকে জয় করার আসল ক্ষমতা।
অ্যাকাডেমি অব অ্যাচিভমেন্ট থেকে পাওয়া। ২০০০ সালের ২৭ অক্টোবর দেওয়া সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ: শিখিত সানী

জেমস ক্যামেরন

পরিশ্রম করলেই কেবল ভাগ্য সহায় হয়

—জেমস ক্যামেরন | তারিখ: ০৩-১১-২০১০

জেমস ক্যামেরন, বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রই নির্মাণশৈলী ও ব্যবসা-সফলতার ক্ষেত্রে ইতিহাস গড়েছে। টারমিনেটর-২ (১৯৯১), টাইটানিক (১৯৯৭) কিংবা অ্যাভাটার (২০০৯)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। ক্যামেরন ১৯৫৪ সালের ১৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন।

আমার ছোটবেলা কেটেছে কানাডার ছোট্ট একটা শহরে। শহরের তীরঘেঁষে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি নদী, যেখানে আমরা রোজ খেলতাম। নায়াগ্রা জলপ্রপাত ছিল মাত্র চার বা পাঁচ মাইল দূরে। পানির সঙ্গে তাই একটা ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, যা আমার কাজেও বারবার উঠে এসেছে। মা ছিলেন গৃহিণী, খুব ভালো ছবি আঁকতেন। আর বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। মায়ের সঙ্গে জাদুঘর দেখতে যেতাম; তাই যখন থেকে আঁকতে শিখেছি, তখন থেকেই জাদুঘরের বিভিন্ন স্মারকের অবয়ব আঁকতে চাইতাম, সেটা হোক না পুরোনো কোনো যোদ্ধার হেলমেট কিংবা মিসরীয় কোনো মমি। এসব কিছু আমাকে আবিষ্ট করে রাখত। আবার প্রকৌশল চর্চাতেও আকর্ষণ ছিল প্রচণ্ড। হতে পারে বাবার সম্মান ও পছন্দকে ধরে রাখার জন্য এটা একটা চেষ্টা ছিল। কিংবা হতে পারে তা প্রযুক্তির প্রতি একটা ভালোবাসা, যা আমি রক্তের টান থেকে অনুভব করেছি।

শিশু বয়সেই আমি সব সময় কিছু একটা নির্মাণ করতে চাইতাম। ‘চলো বানিয়ে ফেলি একখানা ঠেলাগাড়ি, চাকাগুলো নিয়ে আসো, তুমি সেটা ঠিক করো…।’ যখন পেছনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমি আজকের এই আমিকেই সেখানে খুঁজে পাই। মনে পড়ে সেই ছোট্টকালে একটা উড়োজাহাজ বানাতে উঠেপড়ে লেগেছিলাম, আজও তো তেমনটিই করছি, পার্থক্য এই যে এটি বানাতে এখন ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচ পড়ে যায়।

শিক্ষাজীবনে খারাপ নই, ছাত্র হিসেবে ভালোই ছিলাম। কারণ পুরোটাই ছিল জানার প্রতি আমার সহজাত তীব্র আকর্ষণ। আমি কাউকেই খুশি করার জন্য পড়িনি। কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পড়াশোনাও হয়নি যে কাউকে টপকে ভালো করতে হবে। আমি জানতে চাইতাম, শিখতে চাইতাম—বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত সবকিছু। অবসর সময়ে শহরের পাঠাগারগুলোয় সময় কেটে যেত আমার। অনেক সায়েন্স ফিকশন পড়েছি, যা বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝের রেখাকে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট করে তুলেছে। বই আর লেখকদের অভিনব জগৎ আমাকে অদ্ভুতভাবে টানত। আর্থার ক্লার্ক, জন ভগ্ট, হার্লান এলিসন, ল্যারি নিভেন সবাই আমাকে প্রভাবিত করেছেন।

একাদশ গ্রেডের সময় আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ম্যাকেঞ্জি ঠিক করলেন আমাদের স্কুলে একটা থিয়েটার বানাবেন। স্কুলে রেসলিং, ফুটবল, বাস্কেটবলের আয়োজন থাকলেও থিয়েটার ছিল না। আমরা নেই থেকেই কাজ শুরু করেছি। দৃশ্য, পেছনের পর্দা, পোশাক সব উপকরণের জোগাড় করতে হয়েছে। তারপর নাটক প্রযোজনা করেছি। পুরোটাই ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। এবং আমরা সফল হয়েছি। নিয়ম মেনে ঠিকঠাকভাবেই এগিয়েছিলাম। আমাদের পুরো প্রকল্পটাই ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। সেটা সম্ভব করেছিলেন ম্যাকেঞ্জি। এটাই তাঁর অভিনব একটি বৈশিষ্ট্য। এ জন্যই আমি মনে করি, জীবনের সঠিক সময় এমন কিছু ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য, যাঁরা তোমাকে বদলে দেবে, তোমার ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আমি কখনোই নিজেকে ঈশ্বরের উপহার মনে করি না। নিজেকে অন্য শিশুদের চেয়ে আলাদা করে দেখারও কিছু নেই। নিজেকে সবার থেকে আলাদা বানিয়ে দেয় চারপাশের পরিবেশ এবং তোমার অভিনব ক্ষমতা। আমি জীবনের ১০টি বছর এমনভাবে কাটিয়েছি, যেখানে আমাকে শুনতে হয়েছে আমি ইডিয়ট কিংবা একটা জোক ছাড়া কিচ্ছু নই। তার পরের ২৫ বছর আমার চেষ্টাটা ছিল শুধু নিজেকে একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করা। সফলতা সেখানে সামান্যই এসেছে। সফল হওয়ার জন্যই কি আমার নিয়তিকে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল? ঠিক বলতে পারব না। তবে আমি মনে করি, যত পরিশ্রম করবে ততই ভাগ্য তোমার সহায় হবে। দীর্ঘ পথের অর্জনে ‘সুযোগ’ বড় কোনো কিছু নয়। কিন্তু একটি মাত্র সুযোগ সবকিছু বদলে দিতে পারে। তবে সেখানেও ওই সুযোগকে চেনার একটা ব্যাপার আছে, সুযোগ কাজে লাগাতে পারার একটি ক্ষমতার প্রয়োজন আছে। অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিই সফল হতে পারেননি, কারণ তাঁরা অনেক বেশিই ভেবেছেন এবং খুব সতর্ক ছিলেন, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হয়ে পা ফেলার ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। যদি তোমার মধ্যে আত্মবিশ্বাস না থাকে, তাহলে সুযোগও তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে।

জীবনের অনেকটা সময় ধরেই বুঝতে পারিনি যে ছবি বানাব, ছবির নির্মাতা হব, বিজ্ঞানকে নিয়েই গভীরভাবে মগ্ন ছিলাম। ছোটবেলার অনেকটা সময় পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের পর্দায় খুঁজতাম প্রোটোজোয়া। কখনো টেলিস্কোপে চোখ মেলে নক্ষত্ররাজিতে হারিয়ে যেতাম। আমার চিন্তাভাবনার পরিসরটা ছিল বিজ্ঞানের বিচিত্র দিককে ঘিরেই। আঁকার প্রতি টান সব সময়ই ছিল। পদার্থবিজ্ঞান আর গণিত নিয়ে পড়াশোনার পাঠ শেষ হলো। তারপর এক অসহনশীল শিক্ষকের পাল্লায় পড়ে ক্যালকুলাসের সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ ঘটে। আমি ইংরেজি বিষয়ে মনোনিবেশ করি, কারণ আমি লিখতেও চাইতাম খুব। এ দুই দিকে উদ্ভ্রান্ত পথ চলতে চলতে ২৫-২৬ বছরে আমি ঠিক করি, ছবি বানানো নিয়ে অগ্রসর হব। নিজেকে ভেবেছিলাম ছবি বানানোর কারিগর হিসেবে, পরিচালক হিসেবে নয়। তবুও…

যে ছবিগুলোর তেমন কোনো বাঁধাধরা প্যাটার্ন নেই, সেগুলোই এসে আমার পছন্দের তালিকায় হাজির হয়। আমি দেখেছি, নিয়মকানুন আমার জন্য ঠিক কাজ করে না। ভালো লাগে যেখানে অনেক হাঙ্গামা থাকবে, শব্দ থাকবে, অস্থিতিশীলতা থাকবে—পরিপূর্ণ কিছু নয়। সেখানেই তো নিজেকে উপস্থাপনের সুযোগ মেলে। যদি সবকিছু তোমার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত কিংবা টিপটপ হয়ে থাকে, তবে জাদুকরি কোনো কিছু উপহার দেওয়ার জন্য দরজাটা তো খোলা যায় না। পরিচালকের মন থেকে তো আর মোহনীয় জাদুর স্পর্শটা প্রতিফলিত হয় না, এটা আসে অভিনয় কুশলীর আত্মার মধ্য থেকে। আন্দোলিত হয়েছি উডস্টক, দ্য গ্র্যাজুয়েট, বান এন্ড ক্লাইড, দ্য গডফাদার, স্টার ওয়ারস প্রভৃতি ছবি থেকে।

ছবি বানানোর কথা শুনে পরিবার কখনোই তেমন সন্তুষ্ট হয়নি। বাবা নারাজ ছিলেন, তিনি আসলে আমার ব্যর্থ হওয়ায় অপেক্ষায় ছিলেন, যেই মুহূর্তে তিনি জানাবেন যে আমার আসলে একজন প্রকৌশলী হওয়াই উচিত ছিল। তাঁর পক্ষ থেকে সহয়তা ছিল একেবারে শূন্য। মা অবশ্য অনেক আগে থেকে এ ধরনের সৃষ্টিশীল শিল্পের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তাই আশ্চার্য এক গতি ছিল সেখানে, যা আমাকে দীর্ঘ সময়েও এ পথ চলতে সাহায্য করেছিল, যদিও তা দেখতে পাওয়া ছিল দুষ্কর।

যখন ছবি বানানো শুরু করলাম তখন মনে মনে কী অর্জন করতে চেয়েছি সেটা নিয়ে বলা কঠিন। আমার মনের মধ্যে তখন অসংখ্য ছবি, ফ্রেম, দৃশ্যের আনাগোনা করছিল। অনেক বেশি বিজ্ঞান কল্পকাহিনির রাজত্ব ছিল সেখানে। ভিন্ন পৃথিবী আর ভিন্ন পরিবেশের জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমি। আমার জন্য এটা ছিল কল্পনা কিন্তু পুরোদস্তুর কল্পনাই কি ছিল তা? পুরোটা জীবন আমাকে অনেক অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে। অনেক শিখেছি সেখান থেকে। আজও শিখছি। তবে শেখাগুলোকে নিয়েই আরও মহৎ কিছু তৈরি করার বড় শিক্ষাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। টাইটানিক ছবিটি আমার সব শেখাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অসংখ্য শিল্পীর কাজ ছিল সেখানে। সবার কাছে এত প্রভাবিত হয়েছি যে মনে হয়, তাঁদের ছাড়া এতটা সম্ভব হতো না।

যখন তুমি কোনো বৃহৎ ক্ষেত্রে কাজ করবে ও অনেককে নিয়ে তোমার কাজ করতে হবে তখন আত্ম সন্দেহের প্রয়োজন নেই। যদি তোমার কাজ খারাপ হয় তবে তুমি তাঁদের কাছ থেকে সেখানকার ভুলগুলো সম্পর্কে সমালোচনা শুনবে, যদি ভালো হয় তবে তুমি ভালোই শুনবে। অনেকেই তোমার সঙ্গে থাকবেন, যাঁরা তোমাকে পথ এগিয়ে নিয়ে যাবে, তাই সন্দেহের কোনো স্থান এখানে নেই। এমন আবহাওয়াতেই আমরা কাজ করি।

ছবি বানানোর যে বিশাল ক্ষেত্র সেখানে কিছু পদ্ধতি কখনোই পরিবর্তিত হয় না। প্রযুক্তি আর নির্মাণকৌশলের সব ধারাটাই বদলাতে থাকে। এগুলোর বদল দিয়েই ছবির ধারা ভিন্নরূপ ধারণ করে। দৃশ্যপট বদলে যায়। সেখানে সংযোজন ও বিয়োজন ছবির চাওয়াকে সবার সামনে তুলে ধরে। জীবনের ছকটা তো সে রকমই।

অ্যাকাডেমি অব অ্যাচিভমেন্ট থেকে পাওয়া। ১৯৯৯ সালের ১৮ জুন দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ: শিখিত সানী